দেশের লক্ষ লক্ষ কর্ণিয়াজনিত অন্ধের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মৃত্যুর ৪ – ৬ ঘন্টার মধ্যে দুটি চোখ সংগ্রহ করার জন্য জীবিত অবস্থায় চক্ষুদানের অঙ্গীকারকে মরণোত্তর চক্ষুদান বোঝায়। কর্নিয়া হলো চোখের সামনে অবস্থিত একটি স্বচ্ছ অংশ, যার মাধ্যমে আলো চোখের মধ্যে প্রবেশ করে। যদি কোনো কারণে কর্নিয়া অস্বচ্ছ হয়ে যায়, তাহলে ওই চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থাকে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১৪ লাখ মানুষ অন্ধত্বে ভুগছে। যার মধ্যে কর্ণিয়াজনিত অন্ধত্বের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। আগামী ১০ বছরে কর্ণিয়াজনিত অন্ধত্ব দূর করতে হলে প্রতি বছর প্রায় ৩৬ হাজার কর্ণিয়া সংগ্রহ করা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের মোট মৃত মানুষের ২% কর্ণিয়া সংগ্রহ করতে পারলেই কেবল বাংলাদেশ থেকে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূরে করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন সচেতনতা এবং স্বদিচ্ছা। এতে চেহারা বিকৃতির কোনো আশংকা নেই। মৃত ব্যক্তির চোখের স্থানে একটি সিনথেটিক আইবল লাগিয়ে দেয়া হয়, যাতে কোনো অবস্থাতেই বোঝা সম্ভব না হয় যে মৃতব্যক্তির চক্ষুদান করা হয়েছে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি মাত্র কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
মানব দেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন (সংশোধন) আইন ২০১৮ সনের ৫নং আইনের ধারা-৫ মোতাবেক “চক্ষু বিযুক্তকরণের ক্ষেত্রে মৃতদেহ অন্য ব্যক্তির নিকট বা প্রতিষ্ঠান বা স্থানে থাকিলে উক্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা স্থান যে জেলা প্রশাসকের প্রশাসনিক এখতিয়ারাধীন তিনি বা ক্ষেত্রমত, তাহার নিকট হইতে এতদুদ্দেশ্যে লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি অনুরূপ বিযুক্তির জন্য লিখিত অনুমতি প্রদান করেন।”
১৯৬৬ সালে মিশরের সর্বোচ্চ মুফতি প্রথম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের ব্যাপারে এবং ১৯৭৯ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে আলেমদের সর্বোচ্চ কাউন্সিল চিকিৎসার প্রয়োজনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান এবং প্রতিস্থাপনের পক্ষে ফতোয়া জারী করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠেয় মুসলিম লীগের ফিকাহ্ একাডেমীর ৮ম সভায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান ও প্রতিস্থাপন ইসলাম ধর্মের সাথে সংগতিপূর্ণ বলে মতামত প্রদান করা হয়। ১৯৮৬ সালে জর্ডানের আম্মানে অনুষ্ঠেয় অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কাউন্সিলের ফিকাহ্ কাউন্সিল এর সভায়অঙ্গ-প্রত্যঙ্গদানের স্বপক্ষে (জীবিত এবং মৃত্যুর পর) আদেশ জারী করে (আদেশ নং- ৩/০৭/৮৬)। ওআইসি মরণোত্তর চক্ষুদানকে অনুমোদন দিয়েছে।
বৌদ্ধধর্মে চক্ষুদানের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে বা হিন্দুধর্মেও চক্ষুদানের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
কর্নিয়ার অস্বচ্ছতাজনিত কারণে অন্ধ যে কোন ব্যক্তিই সন্ধানী থেকে কর্নিয়া লাভের উপযুক্ত। এজন্য তাকে চক্ষু বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থাপত্রসহ নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার, দশ কপি করে পাসপোর্ট বা স্ট্যাম্প সাইজের ছবি এবং সার্ভিস চার্জ বাবদ ১০০০ টাকা সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের ক্ষেত্রে এ চার্জ মওকুফযোগ্য সংগৃহিত কর্ণিয়া সমিতির পক্ষে কেবলমাত্র ২৪ ঘন্টা বা বড়জোর ৪৮ ঘন্টা সংরক্ষন করে রাখা সম্ভব।
আমাদের দেশে কর্নিয়া সংগ্রহে যেসব বাধা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলোঃ
অনেকে চক্ষুদান বিষয়ে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগে। এর মূল কারণ সচেতনতার অভাব অথবা ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা। এ জন্য অনেকে চক্ষুদান করার ব্যাপারে সম্মতি দিলেও নিকটাত্মীয়রা মৃত ব্যক্তির অঙ্গ নেওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে দরকার ব্যাপক মোটিভেশন। আর এই মোটিভেশনের কাজটি করার দায়িত্ব আপনার, আমার, সবার। কেননা আপনার, আমার একটু সদিচ্ছায় একজন পেতে পারে তার দৃষ্টিশক্তি।আসুন, রক্তদানের মতো মরণোত্তর চক্ষুদানেও আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ হই।